gd

Today’s Designer, Tomorrow’s Entrepreneur

একটা সময় ছিল যখন “ডিজাইনার” মানেই ধরে নেওয়া হতো কারো অফিসে বসে লোগো বানানো, পোস্টার সাজানো বা প্রিন্টের কাজ দেখাশোনা করা একজন কর্মী। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে, বিশেষ করে ডিজিটাল অর্থনীতির এই সময়ে, একজন দক্ষ গ্রাফিক্স ডিজাইনার শুধু একজন কর্মী নন তিনি হয়ে উঠতে পারেন একজন সম্পূর্ণ উদ্যোক্তা। নিজের এজেন্সি, নিজের ব্র্যান্ড, নিজের প্রোডাক্ট লাইন সবকিছুর সম্ভাবনা আজ একজন ডিজাইনারের হাতের মুঠোয়।

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে গ্রাফিক্স ডিজাইন টেকনোলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রতি সেমিস্টারে আমি দেখি, কীভাবে একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে একজন নিছক “শিক্ষার্থী” থেকে একজন সম্ভাবনাময় “উদ্যোক্তা”-এ রূপান্তরিত হন। আর এই রূপান্তরের পুরো পথটাই আসলে সুনির্দিষ্টভাবে সাজানো আমাদের পাঠ্যক্রমের (কারিকুলাম ২০২২) মধ্যে লুকিয়ে আছে।

পাঠ্যক্রমের যাত্রা: ভিত্তি থেকে ব্যবসা পর্যন্ত


(ছবি: গ্রাফিক্স ডিজাইন টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী হতে  ৩ডি প্রিন্টার চালনা শিখছে)

১ম–২য় সেমিস্টার: বুনিয়াদ তৈরি

শুরুটা হয় প্রিন্টিং বেসিকস, কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন আর ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িংয়ের মতো বিষয় দিয়ে। এখানে শিক্ষার্থীরা শেখে টুলস চেনা, প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়া এবং যোগাযোগ দক্ষতা (বাংলা-ইংরেজি) তৈরি করা যা যেকোনো ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তার জন্য অপরিহার্য প্রথম ধাপ।

৩য়–৪র্থ সেমিস্টার: সৃজনশীলতার বিকাশ

এই পর্যায়ে আসে গ্রাফিক ম্যাটেরিয়ালস, বেসিক ফটোগ্রাফি, গ্রাফিক ডিজাইন-১ ও ২, স্ক্রিন প্রিন্টিং, ইমেজ ক্যারিয়ার প্রিপারেশন এবং ভিডিও অ্যান্ড সাউন্ড এডিটিংয়ের মতো বিষয়। পাশাপাশি যুক্ত হয় বিজনেস কমিউনিকেশন ও অ্যাকাউন্টিং অর্থাৎ, সৃজনশীল দক্ষতার সাথে সাথে ব্যবসায়িক জ্ঞানের বীজও বোনা শুরু হয় এখান থেকেই।

৫ম–৬ষ্ঠ সেমিস্টার: পেশাদারিত্বের ছোঁয়া

এখানেই পাঠ্যক্রম সত্যিকার অর্থে ইন্ডাস্ট্রি-রেডি হয়ে ওঠে অ্যাডভার্টাইজিং ডিজাইন, ফেব্রিক ডিজাইন, প্যাকেজিং ডিজাইন, ডিজিটাল ডিজাইন অ্যান্ড প্রিন্টিং, ডেস্কটপ পাবলিশিং, ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ইমেজ ম্যানিপুলেশন এবং প্রিন্টিং কস্টিং অ্যান্ড এস্টিমেটিং-এর মতো বিষয়। লক্ষ্য করুন “প্রিন্সিপল অব মার্কেটিং” আর “ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট”ও এই পর্যায়ে যুক্ত হয়। একজন ডিজাইনার শুধু সুন্দর কাজ করবেন তা নয়, তিনি জানবেন কীভাবে সেই কাজের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে হয়, কীভাবে বাজারজাত করতে হয়। আর গ্রাফিক প্রফেশনাল প্র্যাকটিস-১-এর মাধ্যমে হাতে-কলমে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাও শুরু হয়ে যায়।

৭ম সেমিস্টার: উদ্যোক্তা মানসিকতার জাগরণ

এই সেমিস্টারেই ঘটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। “ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনরশিপ” নামের বিষয়টি সরাসরি শিক্ষার্থীদের শেখায় কীভাবে একটি আইডিয়াকে ব্যবসায় রূপান্তর করতে হয়। সাথে থাকে অ্যানিমেশন, প্যাকেজিং ডিজাইন-২, অ্যাডভান্সড ডিজিটাল ফটোগ্রাফি, গ্রাফিক ডিজাইন-৫ এবং গ্রাফিক কমিউনিকেশনের মতো উচ্চতর সৃজনশীল দক্ষতা, আর গ্রাফিক প্রফেশনাল প্র্যাকটিস-২-এর মাধ্যমে বাস্তব প্রকল্পে হাতেকলমে কাজের অভিজ্ঞতা।

৮ম সেমিস্টার: বাস্তব জগতে পদার্পণ

সবশেষে থাকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট আর প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার চার বছরের অর্জিত সমস্ত দক্ষতা প্রয়োগ করেন একটি বাস্তব প্রতিষ্ঠানে অথবা নিজস্ব প্রকল্পে। এখানেই তত্ত্ব আর অনুশীলনের মেলবন্ধন সম্পূর্ণ হয়।

কেন এই যাত্রাটাই একজন ডিজাইনারকে উদ্যোক্তা বানায়

(ছবি: গ্রাফিক্স ডিজাইন টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী)

আজকের বিশ্বে একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনারের সামনে যে সুযোগগুলো খোলা আছে, তা আগে কখনো ছিল না:

  • ফ্রিল্যান্সিং ও গ্লোবাল মার্কেটপ্লেস — Fiverr, Upwork, Behance-এর মতো প্ল্যাটফর্মে দেশে বসেই আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করার সুযোগ।
  • ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরি — সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডভারটাইজমেন্ট ডিজাইন, কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং জ্ঞান দিয়ে নিজের বা অন্যের ব্র্যান্ড দাঁড় করানো।
  • প্যাকেজিং ও প্রিন্ট স্টার্টআপ — যারা প্যাকেজিং ডিজাইন ও প্রিন্টিং টেকনোলজি ভালোভাবে শিখেছেন, তারা নিজস্ব প্রিন্ট বা প্যাকেজিং হাউজ শুরু করতে পারেন।
  • AI-চালিত সৃজনশীলতা — ইমেজ রেস্টোরেশন, জেনারেটিভ ডিজাইন টুলসের ব্যবহার শিখে নতুন ধরনের সার্ভিস অফার করা, যা মাত্র কয়েক বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল।
  • ওয়েব ও ডিজিটাল প্রোডাক্ট — ওয়েব ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোর্সের ভিত্তিতে ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল সল্যুশন তৈরি করে নিজেই একটি সার্ভিস-ভিত্তিক ব্যবসা দাঁড় করানো।

আমাদের কারিকুলামে থিওরি ও প্র্যাকটিক্যালের অনুপাত ৭ম সেমিস্টারে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬:৬৪—অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা তত্ত্বের চেয়ে হাতেকলমে কাজ করার মধ্য দিয়েই বেশি শেখেন। এই বাস্তবমুখী শিক্ষাপদ্ধতিই তাদের চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে বরং সমস্যা-সমাধানকারী, স্বনির্ভর পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলে।

ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট শুধু ডিগ্রি দেয় না এখানে “তরুণ উদ্যোক্তা ফান্ড”-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ব্যবসায়িক আইডিয়া বাস্তবায়নেও সহযোগিতা করা হয়। ড্যাফোডিল পরিবারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষার্থীরা ড্যাফোডিলের বিভিন্ন ইনোভেশন ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সুবিধার মাধ্যমে এই সহায়তা পেয়ে থাকে। ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডিজাইন শিক্ষার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীকে একজন সম্ভাব্য উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের একটি বড় অংশ।

আমাদের গ্রাফিক্স ডিজাইন টেকনোলজি বিভাগ সম্পর্কে আরও জানতে ঘুরে আসতে পারেন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট আর ফেসবুক পেইজ থেকে: 

গ্রাফিক্স ডিজাইন ডিপার্টমেন্ট ওয়েবসাইট

ফেসবুক পেইজ 

গ্রাফিক্স ডিজাইন এখন আর শুধু “সুন্দর কিছু বানানো”র বিষয় নয় এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক দক্ষতার সমষ্টি। যে শিক্ষার্থী আজ ডিজাইন সফটওয়্যার শিখছেন, কালই তিনি হতে পারেন একটি সফল ক্রিয়েটিভ এজেন্সি, প্রিন্ট হাউজ বা ডিজিটাল স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা। আমাদের দায়িত্ব শুধু কারিকুলাম শেখানো নয় বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করা, যাতে তিনি বলতে পারেন:

“আমি শুধু ডিজাইনার নই, আমি একজন উদ্যোক্তাও।”

এটাই হোক আমাদের বিভাগের প্রতিটি শিক্ষার্থীর আগামীর গল্প।

সূত্র: ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবিধান ২০২২ (গ্রাফিক্স ডিজাইন টেকনোলজি), ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট।

লিখেছেন:  মো: কামরুল হাসান খান ,বিভাগীয় প্রধান, গ্রাফিক্স ডিজাইন টেকনোলজি, ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট